সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪

উন্নয়ন সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম

এম এম এইচ রায়হানঃ-

‘ব্যাড নিউজ ইজ গুড নিউজ’ ধারণাটি বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতে খুব বেশি অনুসৃত ও অদ্যাবধি পালিত। দেশের সংবাদ মাধ্যমগুলো একটি ইস্যুকে ‘হট কেক’ হিসেবে দেখতে চায় এবং সাধারণ জনগণকে সেভাবে ভাবাতে চায়। খেয়াল করলে দেখা যাবে, যখন রাজন হত্যা হলো, তারপর বেশ কিছুদিন শিশু নির্যাতনকে গুরুত্ব দিয়ে সংবাদ প্রচার-প্রকাশ হয়েছে। রানা প্লাজা ধসের পর দেশের কোন বিল্ডিংয়ে চিড় আছে, কোনটা আগামী দিনে ফেটে যাবে, এমন সংবাদে পরিপূর্ণ ছিল। রডের বদলে বাঁশ ব্যবহার এখন বন্ধ হয়ে যায়নি। আবার শিক্ষকদের হাতে ছাত্রীদের সম্ভ্রম এখনো নষ্ট হয়। কিন্তু এখন সংবাদ মাধ্যমগুলো আমাদের তা ভাবাতে চায় না। একটি বড় ঘটনার পর সংবাদ মাধ্যমগুলোর কাজ হয়ে পড়ে সমজাতীয় সংবাদ খুঁজে বের করা। কিন্তু এসব সংবাদের কোনো ঘটনাই উন্নয়নমূলক বা গুড নিউজ নয়।

পশ্চিমা বা উন্নত দেশের সাংবাদিকতার চর্চায় ব্যাড নিউজকে গুড নিউজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ সেখানে উন্নয়নের জন্য সাংবাদিকতা করার প্রয়োজন পড়ে না। বরং কোনো অনিয়ম বা ব্যাড ইভেন্ট ঘটলে জনগণকে সে বিষয়ে তথ্য সরবরাহ করে সরকারকে চাপে রেখে নিয়ম মানতে বাধ্য করানোর কাজটা এই সাংবাদিকতায় করা হয়। উন্নয়নশীল তথা তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় সাংবাদিকতার ধরন কেমন হওয়া উচিত বা সাংবাদিকতা জাতিগত উন্নয়নে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারে, তা অনেক আগেই ভেবে দেখা দরকার ছিল। সুশাসন ও গণতন্ত্র উন্নয়নের চাবিকাঠি এবং সুশাসন রক্ষায় গণমাধ্যম প্রধান সহায়ক বলে এতদিন যে বুলি আওড়ানো হয়েছে, তাতে কতটুকু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়েছে আর কতটুকু উন্নয়ন নিশ্চিত হয়েছে?

বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তাদানে বাংলাদেশে ঠিক কতগুলো গণমাধ্যম দরকার বা গণমাধ্যম কি আসলেই বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তার জন্য আবশ্যক? দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে সংবাদভিত্তিক মাধ্যমও। বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা কতটুকু বেড়েছে? প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা কতটুকু শুনতে পাই? কৃষি বিষয়ে আলোচনায় কৃষকের বা স্বাস্থ্য জিজ্ঞাসায় কতজন রোগীর বক্তব্য শুনতে পারি? গণমাধ্যম বেড়েছে, ঢঙ বেড়েছে সংবাদ পরিবেশনের, কিন্তু সেই বস্তা পচা পুরনো কথার পরিবর্তন ঘটেনি। এত সংবাদভিত্তিক চ্যানেল বেড়েছে, কিন্তু সংবাদের বৈচিত্র্য কি আছে? কতগুলো সংবাদের প্রতিক্রিয়ার ফলে উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে? নাকি আশ্বাসের বাণী রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে টকশোর টেবিলে ঝরে পড়ছে? আর সম্পাদক ছোটেন অমুক বিশেষজ্ঞকে টাইমটা জানিয়ে দিয়ে বিজ্ঞাপনদাতাকে দর্শক ধরার আশ্বাস দিতে।

গণমাধ্যম আজ যেমন জনগণের কথা চিন্তা করে না, তেমনি দায়বদ্ধতার সাংবাদিকতাও দেখা যায় না। সব চ্যানেলে একই ধরনের সংবাদ। তাতে ঘটনা বেশি, কিন্তু তা সাধারণের প্রয়োজন কম। ফলে গণমাধ্যমে বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা রক্ষা হচ্ছে না। সাংবাদিকতায় সাংবাদিকের মন্তব্য বা পক্ষপাতিত্ব নীতিবহির্ভূত। কিন্তু জাতিগত উন্নয়নে উন্নয়ন সাংবাদিকতার প্রয়োজন কতটা, তা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কেউ বুঝতে চায় না। মালিকপক্ষ মুনাফা খোঁজে, কর্মী বাহিনী পেশাকে গুরুত্ব দেয় আর রাজনীতিবিদরা গণমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন।

অথচ বিপুল সম্ভাবনার এ বাংলাদেশে একটি গণমাধ্যম যদি সঠিক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করে, তাহলে অংশগ্রহণমূলক যে উন্নয়নের কথা বলা হয়, তা শুরু হবে। তৃতীয় বিশ্বে গণমাধ্যমের কাজটা সন্তানের প্রতি মা-বাবার মতো। জনগণকে সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণে রাখা। উন্নয়নের চলকগুলো সাধারণের আলোচনায় নিয়ে আসা। সরকারের নজরে আসে, তেমন সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করা, জাতিগত উন্নয়নে জাতীয়-আন্তর্জাতিক সব সুবিধা পাওয়ার জন্য তথ্য সরবরাহ করা এবং তা রক্ষণাবেক্ষণে সচেতনতা তৈরি করা।

ব্যাড নিউজ একটি চ্যানেলের জন্য অবশ্যই গুড নিউজ, কিন্তু একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য গুড নিউজ বা উন্নয়ন সাংবাদিকতার প্রয়োজন আরো বেশি।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *