মঙ্গলবার, জুলাই ১৭

“ঢাকা জলাবদ্ধ হওয়ার কারণ ও প্রতিকার” মাসুম সরকার অালভী

আরামবাগ, মতিঝিল, ঢাকা।

বাংলাদেশের প্রাণ কেন্দ্র ঢাকা। প্রায় দুই কোটি মানুষের বাসবাস প্রতিদিন এর সংখ্যা বেড়েই চলছে। বর্তমানে গ্রামের মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। মানুষ বৃদ্ধির সাথে সাথে জটিল সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তার মধ্যে রাজধানী ঢাকার মানুষের যেটা প্রধানতম সমস্যা সেটা হল রাস্তায় জলাবদ্ধতা। এই সমস্যা দিন দিন আরো ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। ১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতেই এই শহরের পথ দুই-তৃতীয়াংশ তলিয়ে যায়। এর রয়েছে নানা কারণ। নিম্নে প্রধান প্রধান দিকগুলো আলোকপাত করছি।

অপরিকল্পিত নগরায়ন:
অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শহরে প্রায় দুই কোটি মানুষের বাস। জীবন ও জীবিকার তাগিদে তৈরি হচ্ছে ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট আর এর ফলে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

যত্রতত্রময়লা অাবর্জনা:
অসচেতনভাবে মানুষ খোলা জায়গাতে ময়লা অাবর্জনা ফেলে। আর কঠিন ময়লা আবর্জনা রাস্তার পাশে রাখার কারণে এর এক অংশ ড্রেনে গিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। আর অল্প বৃষ্টিপাত হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

নদী ভরাট:
এই শহরের চারপাশে অবস্থিত বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতালক্ষা প্রভৃতি নদীগুলো ক্রমান্বয়ে ভরাট করে ফেলেছে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা। এই বিশাল জনসংখ্যার এই শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

খাল দখল:
এই নগরীর ৬৫টি খাল এক সময়ে পানি নিষ্কাশনের বিশেষ ভূমিকা রাখতো। কিন্তু রাজধানীর এই খালগুলো এখন খুঁজে পাওয়া কঠিন। সবগুলোই প্রায় চলে গেছে দখলদারদের হাতে। যে কয়টা ছিল তাও ভরাট হওয়ার পথে।

জলাশয় ভরাট :
এহ শহরের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো ভরাট করে অাবাসন গড়ে তোলায় এই শহরের পানি নিষ্কাশনের পথ রূদ্ধ হয়েছে।

বুড়িগঙ্গা দূষণ অার দখল:
এই শহরের প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী আজ দূষণে জর্জরিত। নদীর আশেপাশে বাড়ি আর দোকান তৈরি করে দখলে নিয়েছে। ফলশ্রুতিতে নদীর গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। দূষণে নদীর তলদেশে নানা বর্জ্য জমে এর গভীরতা কমিয়েছে। ফলে পানির প্রবাহ বাড়লেই তা উপচে পড়ে।

সমন্বয়হীন সংস্কার কাজ:
এই শহরে সেবাদানকারী সংস্থাগুলো উন্নয়ন কাজে কোন সমন্বয় না থাকায় সারা বছরই সড়ক খোড়াখুড়ি চলতেই থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলাই যায় — ওয়াসা স্যুয়ারেজ নির্মাণের জন্য একটি সড়ক খোড়া হল, সেই কাজ শেষ হতে না হতেই আবার খোড়াখুড়ি শুরু করল। এমন কাজ চলায় সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

পলিথিন অবাধ ব্যবহার:
এই শহরে চলছে পলিথিনের অবাধ ব্যবহার। পলিথিন ব্যবহার না করার আইন থাকলে ও তার সামান্যটুকুও মানা হয় না। ফলে দুই কোটি মানুষের এই শহরে প্রতিদিন যে বর্জ্য তৈরি হয় তার অধিকাংশ জুড়েই থাকে পলিথিন। এসব পলিথিন পানি নিষ্কাশনের পথগুলো বন্ধ করে দেয়।

ড্রেনের ময়লা ড্রেনে :
খই শহরের বিভিন্ন স্থানে ড্রেন থেকে ময়লা তুলে সেগুলো দিনের পর দিন ড্রেনের পাশেই ফেলে রাখা হয়। ফলে বৃষ্টি হলেই সে ময়লা পুনরায় ঠিকানা হয় ড্রেন। সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।

প্রতিকার:
১৯৯২ সালে রাজধানীর ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে ইনটিগ্রেটেড ফ্লাড প্রোটেকশন প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন না হওয়ায় মহানগরীর জলাবদ্ধতা রোধে তেমন কোনো সাফল্য আসেনি। রাজধানী ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে এ প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়নসহ আরো ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা প্রয়োজন। জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানের জন্য ঢাকা মহানগরীর বর্জ্য বিভাগকে সচেতন হতে হবে। কঠিন বর্জ্য অপসারণের জন্য নগরীর বিভিন্ন স্থানে ডাস্টবিন দিতে হবে এবং এগুলোকে নিয়মিত খালি করে দূরবর্তী নিরাপদ স্থানে সরিয়ে ফেলতে হবে।

বৃষ্টির পানিসহ সব প্রকার তরল বর্জ্য দ্রুত অপসারণের লক্ষ্যে উপযুক্ত স্থানে সঠিক ঢাল ও মাটেন সিউয়ার ও সারফেস ড্রেন লাইন স্থাপনসহ ড্রেনেজ সিস্টেমকে নিয়মিত পরিষ্কার করে সচল রাখতে হবে।
নদীগুলোর দখণমুক্ত করে যথাযথ সংস্কার করে অাগামীতে খাল নদীসহ কোনো জলাধার যাতে দখল বা ভরাট হতে না পারে তার দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।

এ ছাড়া বর্ষা মৌসুমের অাগেই ভরাট হতে যাওয়া খাল নদী খনন, খালের জমাকৃত বর্জ্য এবং স্পয়েল অার্থ অপসারণ করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা সচল রাখতে পারলে তা অাগামীতে রাজধানীর জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে। চলো বদলে যাই, বদলে দেই। গড়ি সবুজ ও বাসযোগ্য ঢাকা বিনির্মাণে কাজ করি।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *