বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৯

ঢাকা থেকে কুমিল্লায় বুলেট ট্রেনে মাত্র ৪৫ মিনিটে!


মোঃ আল আমিন♦ বাংলাদেশে বুলেট ট্রেন চালুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে দ্রুতগতিতে কাজ করছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। মাত্র দেড় ঘণ্টায় ঢাকা-চট্টগ্রামে, ৪৫ মিনিটে ঢাকা-কুমিল্লায় চলাচল করবে এ ট্রেন। লাইন নির্মাণে চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এ রেলপথের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ ডিজাইনের জন্য এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। অর্থ সহায়তা করতে এডিবি, জাইকাসহ বিভিন্ন দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন যুগান্তরকে জানান, বাংলাদেশে বুলেট ট্রেন চালানো এখন সময়ের দাবি। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আর এগিয়ে যাওয়ার পূর্বশর্তই হচ্ছে গতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যক্তিগতভাবে এ প্রকল্প নির্মাণে উদ্যোগ নিয়েছেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে সফলভাবে বুলেট ট্রেন চালু এখন সময়ের বিষয়। এ রুট হলে খুব সহজেই চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ভ্রমণ করা যাবে। অত্যাধুনিক এ রুট নির্মাণ হলে মাত্র দেড় ঘণ্টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পৌঁছা যাবে। এতে পর্যটন খাতও দ্রুত প্রসার লাভ করবে। বুলেট ট্রেনে ভ্রমণ অত্যন্ত আরামদায়ক হয় জানিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দ্রুত কাজ চলছে। চূড়ান্ত ডিজাইন দ্রুত সময়ের মধ্যে শেষ হবে, এর পরপরই মূল প্রকল্প বাস্তবায়নে যাব। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে অর্থ সহায়তা করতে ইচ্ছুক এডিবি, জাইকা, চীন ও এক্সিম ব্যাংক। প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে এ প্রকল্পে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শনের সময় নির্দেশ দিয়েছিলেন দেশে বুলেট ট্রেন চালু করতে হবে- এ তথ্য জানিয়ে এ প্রকল্পটির পরিচালক মো. কামরুল আহসান জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরপরই রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে ওঠেন। ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি ও ডিটেইল ডিজাইন প্রণয়নের জন্য ডিপিপি পাস করা হয়েছে। প্রকল্পটির পরামর্শক নিয়োগের জন্য আহ্বান করা হলে সেপ্টেম্বর মাসে মোট ২১টি বিদেশি কোম্পানি অংশ নেয়। বর্তমানে তা যাচাই-বাছাই চলছে। এদের মধ্যে ৪ থেকে ৭টি কোম্পানিকে সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত করা হবে। তারপর সর্বনিন্ম দরদাতা একটি কোম্পানিকে আগামী মাসের শুরুতে নিয়োগ দেয়া হবে। ২০১৮ সালের মধ্যে সমীক্ষা প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। এতে ব্যয় হবে ১০০ কোটি টাকা। এরপর শুরু হবে মূল প্রকল্পের কাজ।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২৫ জুন কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে এক জনসভায় জাপান সফরের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে কবে হাইস্পিড বুলেট ট্রেন চালু করতে পারব। সেদিন বেশি দূরে নয়। ইনশাআল্লাহ, আমরা বাংলাদেশে করতে পারব। শুধু বুলেট ট্রেনই নয়, আগামীতে পাতাল রেলও করতে পারব।’ এর আগে ২০১৪ সালের ২৪ অক্টোবর রেলপথ মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করতে গিয়ে ‘বুলেট ট্রেন’ চালুর নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) কাজী রফিকুল আলম যুগান্তরকে জানান, বাংলাদেশে বুলেট ট্রেন চলবে এমন স্বপ্ন বাস্তবায়নে ২০১৪ সাল থেকেই রেলপথ মন্ত্রণালয় কাজ করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে প্রকল্প সহায়তা হিসেবে একটি দেশ প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা দেয়ার আশ্বাস রয়েছে। তিনি বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন। রেলপথ নির্মাণ করতে কোনো অসুবিধা হবে না। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা-লাকসাম হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত যাবে লাইনটি। নারায়ণগঞ্জ থেকে দাউদকান্দি পর্যন্ত উড়াল লাইন করতে হবে। এছাড়া শীতলক্ষ্যা, কাঁচপুর, মেঘনা নদীসহ আরও বেশ কয়েকটি নদীর ওপর দীর্ঘ রেলসেতু করতে হবে।

জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম বর্তমান রেললাইনটি ৩২০ দশমিক ৭৯ কিলোমিটার দীর্ঘ। ঢাকা থেকে টঙ্গী-ভৈরব, আখাউড়া-কুমিল্লা হয়ে ট্রেন চট্টগ্রামে পৌঁছে। ফলে সময় লাগে সাড়ে ৭ ঘণ্টা থেকে সাড়ে ৮ ঘণ্টা। কখনও আবার ৯ থেকে ১০ ঘণ্টাও লাগে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ২০০ কিলোমিটারেরও কম রেললাইন হবে। ঢাকা-মদনপুর, দাউদকান্দি-বরুড়া-ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হাইস্পিড রেলপথটি নির্মিত হবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেল ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে সব দিক বিবেচনায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। পর্যটন এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ মহেশখালী ঘিরে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ হাব গড়ে তোলা হচ্ছে। এ কারণে প্রচুর বিদেশিসহ পর্যটক, সাধারণ মানুষ নিয়মিত ঢাকা-চট্টগ্রাম চলাচল করবে। মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাদের মতে, রেল ক্রমাগত লোকসান গুনলেও বুলেট ট্রেন হবে দেশবাসীর স্বপ্ন জয়। বুলেট ট্রেন আয় বাড়াবে। বুলেট ট্রেনের জন্য উপযোগী লাইন বসানো হবে। জাপানের শিনকেনশেন প্রযুক্তির বুলেট ট্রেনে এখনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। ফলে বুলেট ট্রেন যেমন আরামদায়ক হবে তেমনি নিশ্চিত হবে নিরাপত্তাও।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, এ প্রকল্প নির্মাণে বিদেশি লগ্নি টানা সরকারের কাছে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হবে। তাছাড়া রেলওয়েতে দিনের পর দিন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ হলেও রেলকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। রেলে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ পরামর্শক বোর্ড থাকা দরকার। দেশের সার্বিক মানুষের কল্যাণে প্রকল্প নেয়া না হলে তার সুফল পাওয়া যাবে না। অনেক প্রকল্প ঘিরে অনিয়ম হচ্ছে, লুটপাট হচ্ছে, দুর্নীতি হচ্ছে। এমন অনিয়মের মধ্যে যে টাকা বিনিয়োগ করা হচ্ছে তার সিংহভাগই জলে চলে যাচ্ছে। বুলেট ট্রেন প্রকল্প যেন সাধারণ মানুষের হয়, এখানে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি না হয় সেটা দেখতে হবে

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *