সোমবার, আগস্ট ২০

“ধ্যান” আল্ আমিন শাহেদ

আত্ম দর্শণের নামই হল ধ্যান।নিজেকে চেনা,নিজের ভেতরের শক্তিকে সাধনার মাধ্যমে বোঝার যে প্রয়াস তাকেই বলে ধ্যান।
যাকে বৌদ্ধরা বলে ভাবনা,পুরাণ বলে তপস্যা, ইসলাম বলে তাফাক্কুর।
ধ্যান করার জন্য তিনটি বিষয়ের প্রয়োজন হয়।
১)যিনি ধ্যান করবেন ধ্যানী
২)যার বিষয়ে ধ্যান করবেন বা ধ্যেয়
৩)যা করবেন অর্থাৎ ধ্যান।
ধ্যানের বিষয়কে দুটি ভাগে ভাগ করে তা করতে হবে:-
ক)বাস্তবিক
খ)অলৌকিক
ধরুন একটি বিন্দুকে নিয়ে ধ্যান শুরু করেছেন এটা বাস্তবিক আর যখন ভাবতে ভাবতে মহাসিন্দুর সন্ধান পেয়েছেন তখনই তা অলৌকিক।
বর্তমানে বিভিন্নভাবে মেডিটেশনের ক্লাশ আমরা দেখে থাকি সিলভা মেথড,আর্ট অফ লিভিং,যোগাসন,প্রাণায়াম এরা মনকে স্থীর এবং পজিটিভ করে থাকে। তাদের অবস্থান কিন্তু ওখানেই শেষ উর্ধস্তরের জ্ঞান ওখানে নেই। মুক্তির ব্যাবস্থা ওখানে নেই।যে ধর্মীয় ধারণাটা নিয়ে আপনি ধ্যান শুরু করবেন তা সম্পর্কে ভাল ধারণা রাখেন ধর্মীয় গুরু বা আত্মজ্ঞানী মূর্শিদ।

ধর্মীয় ধ্যান শুধু মনকে স্থীর করে থেমে নেই; আরও একধাপ এগিয়ে দেহের প্রতিটি অনু কণার সাথে +জাত সেফাতের সাথে পরিচয় ঘটিয়ে পরমের সাথে সংযোগ স্থাপন হলো ধর্মীয় মেডিটেশন বা তাফাক্কুর এর মূল লক্ষ্য।
এ জ্ঞানের বলেই খিজির (আ:) যা জানতে পেরেছিলেন মূসা (আ:) নবী হয়েও তা জানতে পারেনি।এই তাসাউফের জ্ঞানের শক্তির বলেই হযরত মনসূর হাল্লাজ রহ: বলেছিল আনাল হক বা আমিই সত্য।

একজন আমাকে প্রশ্ন করেছিল যে ভাই ত্রিনয়ন সাধক কি?সনাতন ধর্মালম্বি ভাইরা এটা জানেন যে দেবী দূর্গার কপালের মাঝখানে একটি চোখ জল জল করে এবং সাধকরা তা লাভ করে থাকে ওটাকেই ত্রিনয়ন বলে। যেখানে বলা হয় দেবীর দিব্য দৃষ্টি ওখানে থাকে।
মূলত এটা হল থার্ড আই। এটা এমন এক দৃষ্টি শক্তি যা দ্বারা মানুষের মনোসংযোগের এক উচ্চতর পর্যায় বোঝায় এক বিশেষ ক্ষমতা।ত্রিনয়ন যদি আপনার থাকে শুধু এই পৃথিবী নয় এর বাইরের অংশটাও দেখতে পারবেন। এটা আপনার ধর্মীয় ধ্যান সাধনার মধ্যেই সম্ভব।
এই ধ্যান সাধনা নাকি ইসলামে নেই। আসলে ওরা কানা। দোষ যারা বলে তাদেরও না, কেননা সারাজীবন অজিফার বই ধরিয়ে দিয়ে বলছে বাম স্তনের দুই ইন্চি নীচে কলব স্মরণ করে জিকির করবে। নইলে আইসো আঙ্গুল দিয়ে খোঁচা দিয়ে জারী করে দেই।

কেউ জিকির করতে করতে বেহুঁশ হলে ভাবে রবের দীদার কাশফ হয়ে গিয়েছে । মূলত এটা গন্তব্যহীন। মারেফত লুকোতে লুকোতে মানুষ পথ ভ্রষ্টতার শেষ স্তরে পৌঁছে গিয়েছে। এবং নাস্তিকতাবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
যারা বলে ইসলামে ধ্যান সাধনা নেই ওরা কেউ সূরা আলে ইমরানের ১৯০/১৯১ আয়াত পড়েনি যেখানে আল্লাহ বলেন
“নিশ্চই আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে, দিন-রাত্রীর আবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে। তারা দাড়িয়ে, বসে বা শায়িত অবস্থায় আল্লাহর স্মরণ করে, তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য নিয়ে ধ্যানে (তাফাক্কুর) নিমগ্ন হন এবং বলে, হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি এসব নিরর্থক সৃষ্টি কর নি”। [সূরা আলে-ইমরান ১৯০-১৯১]
এমনকি নবীজী সা. কে আল্লাহপাক বলেছেন, অতএব (তুমি দৃঢ়তার সাথে কাজ কর আর) যখনই অবসর পাও প্রতিপালকের কাছে একান্তভাবে নিমগ্ন হও। [সূরা ইনশিরাহ:৭-৮]
ধ্যানের গুরত্ব সম্পর্কে হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত এক হাদীসে উল্লেখ আছে, নবীজী সা. বলেন, “সৃষ্টি সম্পর্কে এক ঘন্টার ধ্যান ৭০ বছর নফল ইবাদতের চেয়ে উত্তম। [মেশকাত শরীফ, তাফসীর হাক্কি : ১৩/৩২৪]
ধ্যানের বহুমুখী গুরত্বের তাগীদে মহাপুরুষ, অলি-আওলিয়াগণ ধ্যানে নিমগ্ন হয়েছেন। ইমাম গাজ্জালী রহ. এ ধ্যান-চর্চার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হযরত মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি রহ. যিনি বিশেষ পদ্ধতির মোরাকাবার উদ্ভাবক। একদা তিনি গোলাপ বাগানে ধ্যানমগ্ন ছিলেন।

নব্যবিবাহিত এক দম্পতি বৃদ্ধ সাধককে বাগানে দেখে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করে বলে, এ বৃদ্ধ বাগানে চোখ বন্ধ করে কি করছে? মাওলানা রুমি বলেন, আমি চোখ বন্ধ করে যা দেখি, যদি তোমরা তা দেখতে, আমি তো মাঝে মাঝে চোখখুলি, তোমরা তাও খুলতে না।
ইসলামে তাফাক্কুর-ধ্যানের সাথে আত্মশুদ্ধি ও সংশোধনের এবং বাসনা নিরাসক্ত হওয়ার ব্যাপারে কুরআন-হাদীসে তাগীদ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে সে-ই সফল, আর যে নিজেকে কুলষিত করেছে সেই ব্যর্থ মনোরথ হয়েছে। [সূরা শামস : ৯-১০]
সূরা আ’লার ১৪-১৫ আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, নিশ্চয় সাফল্য লাভ করবে সে যে শুদ্ধ হয়। এবং তার পালনকর্তার নাম স্মরণ করে, অতঃপর নামায আদায় করে। [সূরা আলা : ১৪-১৫]
ইমাম গাজ্জালী রহ. দীর্ঘ ১০ বছর নির্জনবাসের মাধ্যমে উপলব্ধি করেছিলেন, আত্মশুদ্ধি ও ধ্যান-মোশাহেদার পথেই মুক্তি। শরীয়তের সাথে সাধনাকে সংম্পৃক্ত করে তিনি ইসলামি জীবনদৃষ্টিতে পূণর্জাগরন ঘটান।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *