রবিবার, মে ২৭

পরীক্ষার ফল ও গিনিপিগ শিক্ষার্থীরা

এবার উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় ফেল করেছে ৩ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি ছেলেমেয়ে। এই ফেল করা ছেলেমেয়েদের কথা কে ভাববে? এই ফেল করা ছেলেমেয়েরা কী করবে?

ফেল করা ছেলেমেয়েরা কী করবে, বলার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্নও আসতে পারে যে পাস করারাই-বা কী করবে?

আমাদের শিক্ষার্থীদের ওপর আমরা যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছি, সভ্য দেশের মানুষ গিনিপিগদের ওপরেও তা করে কি না সন্দেহ। এটা কিন্তু কথার কথা নয়। আমেরিকায় একটা গবেষণাগার পরিদর্শনের সুযোগ আমার হয়েছিল। সেখানকার পরিচালক বললেন, তাঁদের একটা প্রধান কর্তব্য হলো গিনিপিগদের ওপরে কোনো রকম নিষ্ঠুরতা করা হচ্ছে না, তা নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা আমাদের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর ওপরে মর্জিমাফিক নানা ধরনের ‘পদ্ধতি’ চাপিয়ে দিচ্ছি। একটা অপরূপ সুন্দর আইডিয়া বের করা হয়েছিল, ছাত্রছাত্রীরা যেন পড়ে বোঝে আর বুঝে পড়ে। অকারণে যাতে তাদের মুখস্থ করতে না হয়। তার নাম দেওয়া হয়েছিল সৃজনশীল পদ্ধতি। বাঙালির সৃজনশীলতা এই পরীক্ষা-পদ্ধতির উদ্ভাবকদের চেয়ে অনেক বেশি। কাজেই তাঁরা এই সৃজনশীল পদ্ধতিটাকে মুখস্থ করার নতুন উপায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এবং তা করা হয় প্রাইভেট টিউশনি বা কোচিং সেন্টারের মাধ্যমে। শিক্ষক যা লিখে দেবেন, তা-ই মুখস্থ করে লিখতে হবে, তাহলে সৃজনশীলে ছাত্ররা বেশি নম্বর পাবে। এবার উচ্চমাধ্যমিকের ফল গতবারের তুলনায় খারাপ। কারণ, গত বছরের তুলনায় এবার সৃজনশীলে নম্বর রাখা হয়েছে বেশি। এখন এই যে সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তন করা হলো, সেটা করার আগে কি পাইলট প্রকল্প করে দেখা হয়েছিল? জানতে চাওয়া হয়েছিল যে আমাদের শিক্ষকেরা সৃজনশীলের জন্য প্রস্তুত কি না? আরেকটা উদাহরণ দিলে গিনিপিগত্বের ধারণা স্পষ্ট হবে। বলা হলো, প্রাথমিক শিক্ষা হবে ক্লাস এইট পর্যন্ত। খুব ভালো কথা। এরপর চালু করতে গিয়ে দেখা গেল, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণির বেশি চালু করার ক্ষমতা নেই, শ্রেণিকক্ষ নেই, শিক্ষক নেই। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা আর জুনিয়র সমাপনী পরীক্ষা প্রবর্তন করা হয়েছে। উদ্দেশ্য মহৎ, সন্দেহ নেই। কিন্তু এই পোড়ার দেশে শিক্ষার উদ্দেশ্য জ্ঞান আহরণ নয়, দক্ষতা অর্জন নয়, মনের দিগন্ত খুলে দেওয়া নয়। এখানে শিক্ষার উদ্দেশ্য ফল ভালো করা। কারণ, তাতে ভালো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ইত্যাদি হওয়া যায়, তাতে জীবন যেমনই হোক, জীবিকা ভালো হবে। কাজেই শিক্ষার্থীদের আর আনন্দের জন্য শিক্ষা বা আনন্দের মাধ্যমে শিক্ষার সুযোগ নেই। তারা ছুটছে কোচিং সেন্টার থেকে কোচিং সেন্টারে। এদের জন্য চোখ ফেটে পানি আসে। কিন্তু কিছুই কি আমাদের করার নেই?

এর মধ্যে যোগ হয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁস। ছেলেমেয়েরা পরীক্ষার আগের রাতে ফেসবুক খুলে বসে থাকে। প্রশ্ন যদি পাওয়া যায়।

এরা আর পড়াশোনা করবে কেন?

আমাদের শিক্ষার মান খুব নেমে গেছে এবং এটা একটা মহামারি আকার ধারণ করেছে—এই আমার ধারণা। তারপরও আমরা যে জাতি হিসেবে সবাই মিলে মারা যাব না, তার কারণ মানুষ একটা আশ্চর্য জাদুকরি সম্ভাবনার নাম। মানুষ আসলে কখনো ব্যর্থ হয় না।

এই মহামারির মধ্যেও এমন ছেলেমেয়ে আমরা পাই, যারা গণিতে ভালো, সাহিত্যে ভালো। এবারেও ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ ভালো করেছে, এমনকি তারা ভালো করেছে ভারতের চেয়েও। আমরা গণিত অলিম্পিয়াড বা ভাষা প্রতিযোগ করতে ঢাকায় আর ঢাকার বাইরে শিক্ষার্থীদের কাছে যাই। ভাষা প্রতিযোগে মাদ্রাসার ছাত্র প্রশ্ন করে, বাংলা একাডেমি বানান হ্রস্ব ই-কার হলে রাজশাহী বানান দীর্ঘ ঈ-কার কেন? চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান ‘বাংলাবিদ’-এও আমি দেখেছি, শিক্ষার্থীরা এখনো নানা ধরনের বই পড়ছে, এবং তাদের জানার আগ্রহ ও পরিধি খুবই আশাব্যঞ্জক।

সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে বিজ্ঞানী, দার্শনিক, চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক দরকার, তাঁদের সংখ্যা কখনোই বেশি হয় না। তেমন প্রতিভাবান আমরা আমাদের এই ১২ লাখ উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার মধ্য থেকেও একজন-দুজন পাব। দিন বদলানোর নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য একজন মহাত্মা গান্ধী কিংবা বঙ্গবন্ধু দরকার হয়, একজন আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, বিল গেটস লাগে, কোটি কোটি আইনস্টাইন জগতে আসেনও না, দরকারও হয় না। কিন্তু ভালো চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, গবেষক, দার্শনিকও তো আমাদের লাগবে। যে ছেলে আউট হওয়া প্রশ্নপত্রের বদৌলতে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়ে ছাত্ররাজনীতি করে পাস করেছেন এবং একে পাস করিয়ে দিলে আমরা বাঁচি বলে শিক্ষকেরা তাঁকে ডিগ্রি দিয়েছেন, তিনি কী চিকিৎসা দেবেন? বা তিনি যদি ইঞ্জিনিয়ার হন, তাঁর বানানো ভবন তো ভেঙে পড়বেই। কাজেই আমাদের ভালো ছাত্র লাগবে, আর সে জন্য মেধার প্রকৃত বিকাশের ক্ষেত্র লাগবে, প্রকৃত মূল্যায়নও লাগবে। সেই জায়গায় এক ভয়াবহ সংকটের মধ্যে আমরা আছি। এই সংকট আমাদের খাদের কিনারে এনে ফেলেছে, মতান্তরে গভীর খাদে ফেলে দিয়েছে। আমরা শুধু শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হচ্ছি, তা-ই নয়, আমরা পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর কাঁদানে গ্যাসের শেল মেরে তাদের চোখ নষ্ট করেও দিচ্ছি।

অবশ্য কম শিক্ষা পাওয়া, বানান না জানা, গণিত না জানা মানুষও জীবনে ভালো করতে পারে। এবং তাদের জীবনোপলব্ধি সাংঘাতিক উন্নতও হতে পারে। আইনস্টাইন কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ প্রবলেম চাইল্ড ছিলেন, এ পি জে আবদুল কালাম বিমানবাহিনীর পাইলট হওয়ার পরীক্ষায় ফেল করেছিলেন। এই সব উদাহরণ দিলে লোকে বলে, ক্লিশে কথা বলবেন না তো। এখন কি রবীন্দ্রনাথের যুগ? আচ্ছা তাহলে মাশরাফি বিন মুর্তজা কি জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন? আসাদুজ্জামান নূর?

পৃথিবীর সবচেয়ে বড়লোক ১০০ জন বা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড়লোক ১০০ জনের মধ্যেও কি পরীক্ষায় ফার্স্ট হওয়ারা আছে?

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির বিবিসির তালিকায় এক নম্বরে বঙ্গবন্ধু, দুই নম্বরে রবীন্দ্রনাথ। ফার্স্ট বয়রা কোথায়?

আমি বলতে চাচ্ছি, জীবনের পরীক্ষার ফলের সঙ্গে বোর্ডের পরীক্ষার ফলের সম্পর্কটা সরল নয়। আমি রসিকতা করে বলি, তুমি পরীক্ষায় ফার্স্ট হলে ডাক্তার হবে, ফেল করলে হাসপাতালের মালিক হবে। তুমি পরীক্ষায় ফার্স্ট হলে ইঞ্জিনিয়ার হবে, ফেল করলে ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির মালিক হবে। ফার্স্ট হলে সিএ হবে, ফেল করলে ব্যাংকের মালিক হবে। ফার্স্ট হলে সচিব হবে, ফেল করলে মন্ত্রী হবে। এটা রসিকতাই। ভালো ছাত্রদের দরকার আছে। ভালো ফল করারও দরকার আছে।

যারা ভালো ফল করেছ, তাদের বলি, উচ্চমাধ্যমিকের পরের পর্বগুলোই আসল। পড়াশোনা ভালো করে চালিয়ে যাও। যারা ভালো করোনি, তারা হতাশ হয়ো না, ২০ বছর পরে দেখবে তুমি কারও চেয়ে খারাপ করছ না।

আমি শুধু বিল গেটস নিয়ে প্রচলিত গল্পটা বলে শেষ করব। বিল গেটস হার্ভার্ডে একাধিক সাবজেক্টে ফেল করেছিলেন। তাঁর এক বন্ধু সবগুলো সাবজেক্টে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছিলেন। তাঁর বন্ধুটি এখন মাইক্রোসফটে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করেন। বিল গেটস বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমার ছিল অনেক স্বপ্ন আর সেসব আমি পেয়েছিলাম প্রধানত বই থেকে। তোমরা যদি আমার অফিস রুমে যাও, দেখবে বই। বাসায় যাও, আমার পাশে দেখবে বই। আমি যখন গাড়িতে থাকি, তখনো আমার সঙ্গে থাকে বই। যখন প্লেনে থাকি, তখনো আমার সঙ্গে থাকে বই।’

বই পড়তে হবে। আর তোমরা বিতর্ক করো, আবৃত্তি করো, সংস্কৃতির চর্চা করো, খেলাধুলা করো, সামাজিক সেবামূলক কাজ করো, মাদক থেকে দূরে থাকো। ফল নিয়ে হতাশ হয়ো না। যে কাজ ভালো লাগে, সেটা মন দিয়ে করো, আর উৎকর্ষ অর্জনের চেষ্টা করো। আইনস্টাইন বলেছেন, জীবন হলো বাইসাইকেলের মতো, সব সময় প্যাডেল ঘোরাতে হয়, না হলে থেমে যায়। প্যাডেল ঘোরানো বন্ধ করো না। তবে জীবনের চলার পথে চড়াই-উতরাই আছে। ঢালু জায়গায় প্যাডেল মারার দরকার হবে না, উঁচুতে উঠতে গেলে কষ্ট করতেই হবে। আর কবি রবার্ট ফ্রস্ট বলেছেন, ‘জীবন সম্পর্কে আমি এই একটা কথা বলতে পারি যে জীবন চলেই যায়। কারও জীবন আটকে থাকবে না।’

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *