শুক্রবার, মে ২৫

পিছিয়ে গেল ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ উৎক্ষেপণের দিনক্ষণ



সিএন নিউজ ডেস্কঃ-

যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ ও আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের হবার কথা থাকলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। প্রায় এক সপ্তাহ পিছিয়ে গেল বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম যোগাযোগ ও সম্প্রচার উপগ্রহ ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ এর উৎক্ষেপণের দিনক্ষণ।

আগামী ৪ মে আমেরিকান সংস্থা স্পেসএক্স-এর মাধ্যমে ফ্লোরিডা থেকে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ৪ মে বঙ্গবন্ধু উপগ্রহ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে বলে স্পেসএক্স নিশ্চিত করেছেন। স্পেসএক্স-এর ফ্যালকন ৯ রকেট ৩ দশমিক ৫ মেট্রিক টন বিশিষ্ট বঙ্গবন্ধু-১ উপগ্রহ নিয়ে কেপ ক্যানাভেরাল পেড থেকে উৎক্ষেপণ হবে এবং নির্দিষ্ট মহাকাশস্থলে পৌঁছতে আট দিন সময় নেবে।

এই উপগ্রহ উৎক্ষেপণে দায়িত্বপ্রাপ্ত আমেরিকান বেসরকারি মহাকাশ উৎক্ষেপণ ও প্রযুক্তি কোম্পানি স্পেসএক্স গত ৩০ মার্চ এটি গ্রহণ করে এবং এর উৎক্ষেপণে যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করেছে উল্লেখ করে প্রকল্প পরিচালক বলেন, এখন তারা (স্পেসএক্স) শেষ মুহূর্তের প্রয়োজনীয় কাজগুলো করছে।

সরকারি সূত্র জানায়, স্পেসএক্স ইতোপূর্বে ২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর ফ্যালকন-৯ ব্যবহার করে এই উপগ্রহটি উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ওই সময় প্রচণ্ড ঝড়ে (হারিকেন ইরমা) ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বিধায় তখন উৎক্ষেপণ করা হয়নি।

তারা জানান, সরকার ২০১৫ সালের মে মাসে বঙ্গবন্ধু-১ উপগ্রহ প্রকল্পটি গ্রহণ করে এবং একই বছর নভেম্বর মাসে ফ্রান্সের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থালেস অ্যালেনিয়া স্পেস-এর সঙ্গে ২৪৮ মিলিয়ন ডলারে কাজটি সম্পন্ন করার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করে। থালেস অ্যালেনিয়া গত কয়েক মাস আগে বঙ্গবন্ধু-১ উপগ্রহ তৈরির কাজ সম্পন্ন করে এবং ফ্রান্সের ক্যানেসে একটি ওয়্যারহাউসে তা সংরক্ষণ করে। পরে গত ২৯ মার্চ উপগ্রহটি ফ্লোরিডায় স্থানান্তর করা হয়।

উপগ্রহটি নিয়ন্ত্রণের জন্য ইতোমধ্যে গাজীপুরের জয়দেবপুর ও রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়ায় দু’টি গ্রাউন্ড স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। আগামী মাসের শেষ সপ্তাহে উৎক্ষেপণ করা হতে পারে বলে জানা গেছে। ওই মাহেন্দ্রক্ষণকে স্মরণীয় করে রাখতে সারা দেশে উৎসব আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
এর আগে গত ৩ এপ্রিল নিউ ইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদ জানিয়েছিলেন, এপ্রিলের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে এটি উৎক্ষেপণ করা হবে। ওই দিন তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার ৯০২ কোটি টাকা। সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে এক হাজার ৫৪৪ কোটি টাকা এবং বাকি এক হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা বিডার্স ফিন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে ব্যয় সংকুলান হয়েছে।

এদিকে দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে ২৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদলের জন্য গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ও ৫ মার্চ দুটি সরকারি আদেশ জারি হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, উৎক্ষেপণের সময় পিছিয়ে যাচ্ছে এ ধারণা থেকে ওই সরকারি আদেশ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকায় ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ অনুষ্ঠান উদ্বোধন করবেন। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবে তথ্য প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিমসহ ২৬ কর্মকর্তার একটি প্রতিনিধিদল।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ -এর মাধ্যমে নিজস্ব স্যাটেলাইটের অধিকারী বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর ফ্রান্সের থ্যালেস এলেনিয়া স্পেসের সঙ্গে বিটিআরসির এই স্যাটেলাইট নিয়ে মূল কাজ শুরুর চুক্তি সই হয়। স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণব্যবস্থা, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা ও ঋণের ব্যবস্থা করছে ফ্রান্সের ওই নির্মাতা প্রতিষ্ঠান। এই স্যাটেলাইটের উৎক্ষেপণের জন্য রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে ১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অরবিটাল স্লট কেনে বাংলাদেশ। এ জন্য খরচ হয় ২১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে পরামর্শক হিসেবে কাজ করছে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল (এসপিআই)। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি নকশা তৈরি, গ্রাউন্ড স্টেশন ব্যবস্থাপনা, বাজার মূল্যায়ন, স্যাটেলাইট বাজারজাতকরণ এবং স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ করছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বিটিআরসি বলছে, এই স্যাটেলাইটের ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে, যার ২০টি বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে এবং বাকিগুলো ভাড়া দেওয়া হবে। আশা করা হচ্ছে, এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য যে ব্যয় হচ্ছে তা এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে উঠে আসবে।

এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দেশের দুর্গম এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা পাওয়া যাবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এটি সহায়তা দেবে। এ ছাড়া এই স্যাটেলাইট বিদেশনির্ভরতাও কমাবে। বর্তমানে বিদেশি স্যাটেলাইটের ভাড়া বাবদ প্রতিবছর এক কোটি ৪০ লাখ ডলার খরচ হয়। নিজস্ব স্যাটেলাইট হলে এ টাকা দেশেই থাকবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে প্রাথমিক এবং রাঙামাটির বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রে দ্বিতীয় গ্রাউন্ড স্টেশনের নির্মাণকাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর এটি পরিচালনা, সফল ব্যবহার ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য এরই মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কম্পানি লিমিটেড নামে একটি কম্পানি গঠন করা হয়েছে। নতুন এই কম্পানিতে কারিগরি লোকবল নিয়োগ এবং তাদের প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *