সোমবার, আগস্ট ২০

বেঙ্গল টাইগার কমছে বাংলাদেশে বাড়ছে ভারতে

সিএন নিউজ ডেস্কঃ
রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারতসহ ১৩টি বাঘসমৃদ্ধ দেশের সরকারপ্রধানদের ঘোষণা ছিল, ২০২২ সাল নাগাদ নিজ নিজ দেশে এ প্রাণীটির সংখ্যা দ্বিগুণ করার। এর পর কেটে গেছে সাত বছর। এ সময়ে ভারতে প্রাণীটির সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশে উল্টো চিত্র। বন বিভাগের সাবেক উপপ্রধান বন সংরক্ষক তপন কুমার দে ১৩টি দেশে বাঘের সংখ্যা নিয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছেন। তাতে দেখা গেছে, ২০১০ সালে ভারতে বাঘের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৭০৬টি; এখন দুই হাজার ২২৬টি। আর বাংলাদেশে ২০১০ সালে বাঘ ছিল ৪৪০টি, সাত বছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০৬টিতে। রাশিয়ায় গত সাত বছরে বাঘের সংখ্যা ৩০৬টি থেকে বেড়ে ৪৪৩ হয়েছে। এ বাস্তবতায় আজ শনিবার বাঘ দিবস পালিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে। সুন্দরবন বন বিভাগও আলোচনাসভা, সমাবেশসহ নানা কর্মসূচি নিয়েছে। বন বিভাগের আয়োজনে প্রথমবারের মতো বাঘ দিবসের অনুষ্ঠান হচ্ছে এবার বাগেরহাটে। প্রতিপাদ্য, ‘বাঘ আমাদের গর্ব, বাঘ রক্ষা করব’।দুনিয়ার নানা জায়গায় গত শতকেই প্রাণীটির ৯৭ শতাংশ মারা পড়েছে। ফলে এটি বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলেছে। সরকারিভাবে দাবি করা হচ্ছে, সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘ আছে ১০৬টি আর ভারতীয় অংশে ৭৬টি। সব মিলিয়ে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১৮২। তবে ক্যামেরা ট্রাপিংয়েরমাধ্যমে গণনার ওই পদ্ধতি নিয়ে নানা কথাবার্তা ওঠায় আবারও নতুন করে গোনা হচ্ছে। এবারকার গণনায় প্রাণীটির সংখ্যা বাড়তে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।সুন্দরবনের বাঘকে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বলা হলেও এর প্রকৃত নাম বেঙ্গল টাইগার। গবেষণায় তপন কুমার দে দেখিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনে বাঘের সঙ্গে মানুষের দ্বন্দ্ব কমে গেছে। তাঁর মতে, এর মানে হলো—বাঘের সংখ্যা হয়তো আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। ১০ বছর আগেও বনে ২০ থেকে ২৫ জন মানুষ বাঘের আক্রমণে নিহত হতো। এখন সেখানে মারা যাচ্ছে মাত্র এক থেকে দুজন। আজ বাঘ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তপন কুমার দের প্রতিবেদনটি উপস্থাপনের কথা রয়েছে।কেন বাংলাদেশে বাঘ কমছে—এমন প্রশ্নে তপন কুমার দে কালের কণ্ঠকে বলেন, বাজেট আর নিবেদিত লোকের অভাব। বাঘের সংখ্যা বাড়াতে যে ধরনের পরিকল্পনা, পাচার রোধে করণীয় ও বাজেট থাকা দরকার ছিল, তা নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।বহুলভাবে স্বীকৃত যে চোরা শিকারিদের কবলে পড়ে বাঘ মারা পড়ছে। মাঝেমধ্যে এর চামড়া উদ্ধার হচ্ছে। ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবন (শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ) এলাকায় ১০টি চামড়া উদ্ধার হয়েছে।অনুসন্ধানে জানা যায়, বাঘ হত্যায় তৎপর আছে বড় ছয়টি শিকারি দল। তারা সুযোগ পেলেই প্রাণীটির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিভিন্ন দেশে পাচার করে। পশ্চিম সুন্দরবন (খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ) বিভাগে শিকারিরা বেশি তৎপর। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে এ পর্যন্ত শিকারি, বনদস্যুদের হামলা, গ্রামবাসীর পিটুনি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সুন্দরবনে ৭০টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। আরো একটি কারণে সুন্দরবনে অস্তিত্ব সংকটে পড়ছে বাঘ। বনে বাস্তুতন্ত্র (ইকোলজি) দ্রুত বদলে যাচ্ছে। সুন্দরবনের মাটি ও পানিতে বিপুল পরিমাণ লবণ জমা হওয়ায় বাঘের খাদ্য শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। এ ছাড়া মরে যাচ্ছে ছোট গাছ ও তৃণজাতীয় উদ্ভিদ, যেগুলো প্রধানত হরিণের খাবার। আর খাবারের অভাবে দ্রুত কমছে হরিণ। ফলে বাঘও খাদ্য সংকটে পড়েছে।প্রধান বন সংরক্ষক সফিউল আলম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বন বিভাগ সচেষ্ট আছে। সেখানকার কমিউনিটিকে সচেতন করে তোলা হচ্ছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কাজ করছে। তাঁর মতে, দেশে এখন বাঘের সংখ্যা হবে দেড় শতাধিক।তপন কুমার দে তাঁর প্রতিবেদনে দেখিয়েছেন, ২০১০ সালে নেপালে বাঘের সংখ্যা ছিল ১২১টি, সেটি এখন বেড়ে ১৯৮ হয়েছে। ভুটানে ২০১০ সালে ছিল ৭৫টি, এখন ১০৩টি। সুন্দরবনের বাঘ সংরক্ষণে বেশ কয়েকটি সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, সুন্দরবনের আশপাশে সব ধরনের ভারী শিল্প ও কলকারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। বনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচল কমিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া চিহ্নিত শিকারিদের ধরার জন্য গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে হবে।এ বিষয়ে বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির বলেন, সুন্দরবনে কর্মরত বন বিভাগের কর্মকর্তাদের জন্য ঝুঁকি ভাতার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। টহল জোরদারে বাজেট বাড়ানোরও চেষ্টা চলছে।জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান মনে করেন, বাঘ রক্ষায় শিকারি ও পাচার বন্ধ করা জরুরি। স্থানীয় মানুষদের এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। গত বছর ইন্টারপোলের এক প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, সুন্দরবনে বাঘ হত্যা ও পাচারের সঙ্গে স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী নেতা জড়িত।বন বিভাগের তথ্য বলছে, পৃথিবীর মাত্র ১৩টি দেশে এখন বাঘ আছে। দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, ভুটান, নেপাল ও রাশিয়া।বন সংরক্ষক জাহিদুল কবির বলেন, বাঘের আটটি প্রজাতির মধ্যে এরই মধ্যে বালিনিজ টাইগার, জাভানিজ টাইগার ও কাম্পিয়ান টাইগার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে পাঁচটি প্রজাতির বাঘ কোনো রকমে টিকে আছে। এগুলো হলো বেঙ্গল টাইগার, সাইবেরিয়ান টাইগার, সুমাত্রান টাইগার, সাউথ চায়না টাইগার ও ইন্দো-চায়না টাইগার। বন বিভাগের দেওয়া তথ্য মতে, ১৯০০ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল এক লাখ এবং বর্তমানে এর সংখ্যা তিন হাজার ৮৯০টি।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *