মঙ্গলবার, জুলাই ১৭

“লালন জীবন ও দর্শন” মাসুম সরকার অালভী

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া। মাহাত্মাে লালন শাহ একাধারে একজন অাধ্যাত্মিক বাউল সাধক মানবতাবাদী সমাজ সংস্কারক, দার্শনিক অসংখ্য অসাধারণ গানের গীতিকার সুরকার ও গায়ক ছিলেন। অনুমানিক ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান বাংলাদেশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। লালনের জন্ম কোথায় তা নিয়ে বির্তক রয়েছে। লালন নিজে কখনো তা প্রকাশ করেননি।

হিতকরী পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ নিবদ্ধে বলা হয়েছে লালন তরুণ বয়সে একবার তীর্থেভ্রমণে বের হয়ে পথিমধ্যে গুটিবসন্ত রোগে আত্রুান্ত হন। তখন তার সাথীরা তাকে মৃত ভেবে পরিত্যাগ করে চলে যায়। কালিগঙ্গা নদীতে ভেসে আসা মুমূর্ষু লালনকে উদ্বার করেন।ছেঁউড়িয়া গ্রামের মলম ফকিরের স্ত্রী মতিজান বিবি। মলম শাহ ও তার স্ত্রী মতিজান তাদের বাড়িতে নিয়ে সেবা শুশ্রূষা দিয়ে সুস্থ করেতোলেন। আজীবন লালন তার দীক্ষা গুরু সিরাজ সাঁইকে শ্রদ্ধা করেছেন এবং তার কাছে থেকে পথ নির্দেশনা পেয়েছেন।

কুষ্টিয়াতে অাখড়ায় স্থায়ী বসবাস করার এক পর্যায়ে বিশাখা নাম একজন মহিলা বয়সে লালন আপেক্ষা অনেক ছোট লালন ফকিরের সঙ্গে ছেঁউড়িয়াতে আসতেন এবং সেই থেকে তিনিই আমৃত্যু লালন ফকিরকে দেখাশুনা করতেন। মলম ফকির ছেঁউড়িয়া গ্রামে তার যে নিজস্ব সম্পত্তি ছিল তা লালন ফকিরের নামে দান করেন। যা এখন লালন ফকিরের আখড়া বাড়ী ও সমাধিসৌধ এলাকা।

বাউল গানের অগ্রদূত লালন, ধর্ম বর্ণ গোত্রসহ সকল প্রকার জাতিগত বিভেদ থেকে সরে এসে মানবতাকে সর্বোচ্চ স্থানে দিয়েছেন। এই মনোভাব থেকেই তিনি তার গানসমূহ রচনা করেন। তার গান ও দর্শন যুগে যুগে রবী ঠাকুর, নজরুলের মতো বহু খ্যাতনামা কবি সাহিত্যিক, দার্শনিক, বুদ্ধিজীবীসহ অসংখ্য মানুষকে প্রভাবিত করছে। ললনের গানে মানুষ ও সমাজই ছিল মুখ্য। লালন বিশ্বাস করতেন সকল মানুষের কোন ধর্ম, জাত,বর্ণ লিঙ্গ, কুল নেই। মানুষেরর দৃশ্যমান শরীর এবং অদৃশ্য মনের মানুষ পরস্পর বিচ্ঝিন্ন। সকল মানুষের মনে ঈশ্বর বাস করেন। লালনের এই দর্শনকে কোন ধর্মীয় অাদর্শের অন্তর্গত করা যায় না। লালন মানবাত্মাকে বিবেচনা করেছেন রহস্যময় অজানা এবং অস্পৃশ্য এক সত্তা রূপে।

খাঁচার ভিতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়
তারে ধরতে পারলে মন বেড়ি
দিতাম পাখির পায়।
এ গানে লালন মনের অভ্যন্তরের সত্তাকে তুলনা করেছেন এমন এক পাখির সাথে, যা সহজেই খাঁচারূপী দেহের মাঝে আসা যাওয়া করে, কিন্তু তবুও একে বন্দি করে রাখা যায় না। লালন সাঁই ছিলেন উদার ও অসাম্প্রদায়িক ধর্মসাধক এবং তিনি তার গানে মানবতার বাণী প্রচার করতেন। তিনি সবচেয়ে গুরুত্ব দেন দেহের ভেতরকার আত্মাকে। তার মতে আত্মাকে জানতেই পরমত্মা বা সৃষ্টিকর্তাকে জানা যায়। অাত্মা দেহে বাস করে তাই বাউলেরা দেহকে পবিত্র জ্ঞান করেন। সাধারণত নিরক্ষর হলেও বাউলরা জীবনদর্শন সম্পর্কে অনেক গভীরতা প্রকাশ করেছেন। ফকির লালন তার দর্শন ও মতামত বাউল গানের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন। লালনকে বাউল দর্শন এবং গানের একজন অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাংলা লোকসাহিত্যের একটি বিশেষ অংশ হিসেবে ২০০৫ সালে ইউনেস্কো বাউল গানেকে বিশ্বের মৌলিক এবং দৃশ্যমান ঐতিহ্যসমূহের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে।

লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ছেঁউড়িয়াতে একটি অাখড়া তৈরি করেন, যেখানে তিনি তার শিষ্যদের বাউলতত্ত্ব ও অাধ্যাত্মিক শিক্ষা দিতেন। তার শিষ্যরা তাকে সাঁই বলে সম্বোধন করতেন। তিনি প্রতি বৎসর ফাল্গুন মাসের দোলপূর্ণিমার সময় অাখড়ায় একটি ভাণ্ডারা আয়োজন করতেন। বর্তমান লালন একাডেমি, ছেঁউড়িয়া, কুমারখালী, কুষ্টিয়া সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন, কুষ্টিয়ার সহযোগিতায় এই উসবের আয়োজন করে থাকে।

লালনের গান লালনগীতি বা লালনসঙ্গীত হিসেবে পরিচিত। লালন তার সমকালীন সমাজের নানান কুসংস্কার, সাম্প্রায়িকতা, সামাজিক বিভেদ ইত্যাদি বিরুদ্ধে তার রচিত গানে তিনি একই সাথে প্রশ্ন ও উত্তর করার একটি বিশেষ শৈলি অনুসরণ করেছেন। এছাড়া তার অনেক গানে তিনি রূপকের অাড়ালে ও তার নানা দর্শন উপস্থাপন করেছেন। সমগ্র বিশ্বে, বিশেষ করে বাংলাদেশসহ সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে লালনের বেশ জনপ্রিয়। স্রোতার পছন্দ অনুসারে বিবিসি বাংলার নির্ধারণ করা সর্বকালের সেরা ২০ টি বাংলা গানের তালিকায় লালনের খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায় গানটির অবস্থান অন্যতম।

অাত্মতত্ত্ব,দেহতত্ত্ব,গুরুতত্ত্ব বা মুর্শিদাতত্ত্ব,প্রেমভক্তিতত্ত্ব,সাধনতত্ত্ব,মানুষপরমতত্ত্ব,অাল্লা-নবীতত্ত্ব,কৃষ্ণ -গৌরবত্ত্ব এবংঅারও বিভিন্ন বিষয়ে লালনের গান রয়েছে।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *