রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৩

সিরাজগঞ্জের শহীদ মিনারের ভিত্তি প্রস্তরকারী জিন্নত আলী এখন রিক্সা চালক

সিএন নিউজ বিশেষ প্রতিনিধিঃ-

সিরাজগঞ্জ শহরের ঐতিহ্যবাহী ইলিয়টব্রীজের পূর্ব পার্শ্বেই সিরাজগঞ্জের প্রথম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। কিন্তু কালের বিবর্তনে চরম অবহেলা আর রক্ষানাবেক্ষনের কারণে হারিয়ে যেতে বসেছে ইতিহাস সম্মৃদ্ধ এ শহীদ মিনার। এই ইতিহাস সম্মৃদ্ধ শহীদ মিনারটি নির্মানের সময় প্রথম যে শিশুটি ইট পুতেছিলেন সেই জিন্নত আলী এখন রিক্সা চালক। রিক্সা চালিয়ে যা আয় করেন তা দিয়ে তিনি কোন রকমে জীবন অতিবাহিত করছেন।

আর শহীদ মিনারের উভয়পার্শ্বে সিনেমা,দোকানপাট,এবং তৎসংলগ্ন স্থানে কাচা বাজার বসার কারণে ঢাকা পড়েছে শহীদ মিনারটি। সিরাজগঞ্জ পৌর কর্তৃপক্ষের চরম উদাসীনতার কারনেই এমনটি হচ্ছে বলে শহরবাসী মনে করছেন। কারণ প্রথম শ্রেণীর সিরাজগঞ্জ পৌরসভার দায়িত্বে থাকা এ শহীদ মিনারকে দেখলে কেউ বলবেনা এটিই সিরাজগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার। এমনকি এটি জেলারও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসেবে পরিচিত। খোজ নিয়ে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের এই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটির ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছিলেন তৎকালীন শ্রমিক সংগঠনের সাধারন সম্পাদক নুর মোহাম্মদ বোচার পুত্র জিন্নত আলী।

সে সময় জিন্নত আলীর বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর। এখন সেই জিন্নত আলী ৭০ বছরের বৃদ্ধ। শহরের গয়লা গ্রামে তার নিজ বাড়িতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, কি হবে এসব জেনে। অনেকক্ষণ নিশ্চুব থেকে জিন্নত আলী বলেন, আমি তখন অনেক ছোট। বাবা নূর মোহাম্মদ বোচা ছিলেন সিরাজগঞ্জ রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা। আর ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন ওই ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক। ১৯৫২ সালে মার্চ মাস সিরাজগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল উত্তপ্ত। আওয়ামীলীগ ও মুসলিম লীগের ভিত্তি ছিল শক্ত। মুসলিম লীগ ও সরকারের কড়া নজরদারীর কারণে শহীদ মিনার নির্মাণ ছিল কঠিন কাজ। কিন্তু সে সময়ের শ্রমিক নেতৃবৃন্দরাও ছিল নাছড় বান্দা। তাদের কথা ছিল শহীদ মিনার তারা গড়বেই। ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রয়ারির আগের রাতে শ্রমিকরা বিভিন্ন স্থান থেকে ইট,বালি,সিমেন্ট এনে ইলিয়ট ব্রীজের পুর্বপার্শ্বে রাখে। শহীদ মিনার নির্মানের জন্য শ্রমিকরা ছাত্র,শিক্ষক ও আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে এক জর”রী বৈঠক করে। ওই বৈঠকেই সবাই শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য প্রতিজ্ঞবদ্ধ হন।

কিন্তু কে ভিত্তি স্থাপন করবে। কে আগে ইট গাড়বে সে বিষয়টি নিশ্চত না হওয়াতে সকলের মধ্যে অনৈক্য দেখা দেয়। পরে সকলের সর্ব সম্মতিক্রমে রিক্সা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদ বোচার ছেলে জিন্নত আলীকে দিয়ে প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণে ভিত্তি প্রস্তরের ইট গড়ানো হয়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকসেনা ও রাজাকাররা সেই অসমাপ্ত শহীদ মিনার ভেঙ্গে দেয়। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৪ সালে পুনরায় সেই শহীদ মিনার নির্মানের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু সেটি হয় পুর্বের শহীদ মিনার থেকে প্রায় ১’শ গজ দুরে। যেটি বর্তমানে সিরাজগঞ্জের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসেবে পরিচিত । ১৯৮৮ সালে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার মাধ্যমে পুনঃ সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়।

সেই থেকে এটি আজ পর্যন্ত পৌরসভাই পরিচালনা করে আসছে। সে সময় কেকে উপস্থিত ছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে জিন্নত আলী বলেন,আমি অনেক ছোট ছিলাম তাই তখন ওসব বুঝি নাই। কিন্তু পরে চেষ্টা করে জেনেছি সেসময় উপস্থিত ছিলেন,প্রয়াত সংসদ সদস্য মির্জা মোরাদুজ্জামান,আবুল হোসেন (বর্তমানে সিরাজগঞ্জ পৌরসভার নৈশ-প্রহরী ) বিড়ি শ্রমিক নেতা জসিম উদ্দিন,কান্টু বসাক সহ অনেকেই। যাদের নাম মনে রাখা সম্ভব হয়নি। আবার অনেকে বেঁচেও নেই। ১৯৫২ সালের ভাষার জন্য সংগ্রাম তখনকার দেশের পরিস্থিতি এবং ১৯৫৩ সালে সিরাজগঞ্জের প্রথম শহীদ মিনার স্থাপনের স্মৃতি-চারণ করতেই কেদে ফেলেন জিন্নত আলী। ৭০ বছরের বয়স্ক বৃদ্ধ জিন্নত আলীর ক্ষোভ ও অভিমান সরকারি-বেসরকারী ভাবে কোন দিন রাষ্ট্রীয় দিবসে তাকে কোথাও ডাকা হয়নি। নতুন প্রজন্মকে রাষ্ট্র ভাষার জন্য সিরাজগঞ্জের মানুষের অবদান শহীদ মিনার তৈরীর ইতিহাস জানানোর জন্য কেই তাকে মনে করেনি। তার মতে দেশের সকল জেলাগুলোর মধ্যে সিরাজগঞ্জের শহীদ মিনার নির্মাণের ইতিহাস একটি ব্যতিক্রম। কিন্তু সে ইতিহাস থেকে যাচ্ছে পর্দার অন্তরালে।

জীর্ণ কুটিরে বসবাস করা ৫কন্যা ও ১সন্তানের জনক জিন্নত আলী বয়সের ভারে নূজ্য হলেও অভাবের তাড়নায় তাকে এখনও ধরতে হচ্ছে রিক্সার হাতল। রোগে-শোকে কাতর জিন্নত আলীকে এখনও প্রতিনিয়ত ভাড়ার জন্য ডাক ছাড়তে হচ্ছে। তিনি বলেন স্বাধীনতার ৪৫ বছরে যারাই রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছে আমি সেই সকল রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছে আবেদন করেছি প্রধান মন্ত্রীর সাথে দেখা করার জন্য। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোন প্রধান মন্ত্রীর সাথেই আমার স্বাক্ষাৎ জোটেনি। তাই আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর সাথে একবার সাক্ষাত করা। আর নতুন প্রজন্মের নিকট চাওয়া তারা যেন মুক্তি যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারে এবং সেই সাথে রাষ্ট্র ভাষা অর্জনের ইতিহাসও তাদেরকে জানতে হবে। নতুবা একদিন সকল ইতিহাস হারিয়ে যাবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *