সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৪

হযরত শাহজালাল (র:) এর বাস্তবে ঘটে যাওয়া কিছু অলৌকিক ঘটনা


নবী-রাসূল কিংবা অলী-আউলিয়াগণ প্রয়োজনের প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনার অবতারণা করেছেন, স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে যেসব ঘটনা একদমই অলৌকিক। নবী-রাসূলগণ যখন এ ধরনের ঘটনার অবতারণা করেন, তখন তাকে বলে মুজিযা। একইরকম ঘটনার অবতারণা যখন কোনো অলী-আউলিয়া করেন, তখন তাকে বলে কারামত। সিলেটের হযরত শাহজালাল (র:) সম্পর্কেও বেশ কিছু অলৌকিক ঘটনা প্রচলিত আছে। সেসব ঘটনা মানুষের মুখে মুখে ফেরে। এগুলোর মাঝে কিছু কিছু গ্রন্থিত হয়ে বই আকারে প্রকাশও হয়েছে।

লোকমুখে প্রচলিত ঘটনাগুলো মানুষভেদে অল্পস্বল্প এদিক সেদিক হয়ে যায়। সেজন্য লোকমুখে প্রচলিত কারামতগুলোকে পাশ কাটিয়ে বইয়ে গ্রন্থিত কিছু ঘটনার আলোকপাত করা হবে এ লেখায়। অনেকগুলো ঘটনার মাঝে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো, ধীরে ধীরে বাকিগুলোও উল্লেখ করা হবে।

বিষ যেভাবে শরবত হয়ে গেলো…

হযরত শাহজালাল (র:)-এর জন্মস্থান ইয়েমেন। জন্মস্থান ছেড়ে ভারতবর্ষ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করছেন এমন সময়ে জন্মভূমির কাছে যাবার খুব ইচ্ছে হলো। সেখানে গেলে বাবা-মায়ের কবরও জিয়ারত করতে পারবেন। উল্লেখ্য, হযরত শাহজালালের (র:) জন্মের আগেই তার পিতা মারা যান এবং জন্মের কয়েক মাসের মাথায় তার মাতাও মারা যান। জন্মভূমিতে যাবার লক্ষ্যে ১২ জন সাথী নিয়ে ইয়েমেনের দিকে রওনা হন তিনি। সে সময় ইয়েমেনের বাদশাহ ছিলেন সুলতান ওমর আশরাফ। ততদিনে হযরত শাহজালাল (র:)-এর জ্ঞান-গরিমা, আধ্যাত্মিকতা ও অলৌকিকতার খবর সারা বিশ্ব বিদিত। ইয়েমেনের বাদশাহও তার ব্যাপারে শুনেছিলেন।

যখন শুনলেন হযরত শাহজালাল (র:) ইয়েমেনে আসছেন তখন তার ইচ্ছে হলো হযরত শাহজালাল (র:)-এর আধ্যাত্মিকতার গভীরতা কতটুকু তা একটু পরীক্ষা করে দেখবেন। সে উদ্দেশ্যে তিনি হযরত শাহজালাল (র:) এবং তার সাথীদেরকে রাজদরবারের মেহমান হিসেবে আমন্ত্রণ করেন। তারা উপস্থিত হলে তাদেরকে শরবত পরিবেশন করা হয়। হযরত শাহজালাল (র:)-কে পরীক্ষা করার জন্য তিনি শরবতের মাঝে বিষ মিশিয়ে রেখেছিলেন।

কিন্তু দেখা গেলো, তার দেয়া শরবত পান করেছেন হযরত শাহজালাল (র:) এবং তার সাথীরা। কিন্তু বিষ পান করার পরেও তাদের কিছু হয়নি, সকলেই সুস্থ। কিন্তু অন্যদিকে স্বয়ং বাদশাহ সাধারণ শরবত খেয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন! প্রচলিত তথ্য অনুসারে, হযরত শাহজালাল (র:) তার আধ্যাত্মিকতার বলে শরবতের বিষের ব্যাপারে জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু তারপরেও তিনি শরবত খেয়েছিলেন। তার ভরসা ছিল আল্লাহর উপর। তিনি ভাবলেন, আল্লাহ সবকিছুই পারেন, আমাদের হায়াত থাকলে আল্লাহ চাইলে এই বিষকে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারেন। অন্যদিকে তিনি চাইলে সাধারণ পানীয়কেও বিষ করে দিতে পারেন।

ইসলামের নিয়ম অনুসারে, খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে হয় এবং এই বাক্যের অনেক অলৌকিক গুণ আছে। তারা সকলে বিসমিল্লাহ বলে সেই শরবত পান করলেন এবং সকলেই নিরাপদ রইলেন। উপরন্তু বিষহীন সাধারণ শরবত পান করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন বাদশাহ। খোদার লীলাখেলা বোঝা বড়ই কঠিন। বিষ হয়ে যায় শরবত আর শরবত হয়ে যায় বিষ। এ ঘটনা দেখে ভীত হয়ে বাদশাহর পুত্র সিংহাসন ছেড়ে দিয়ে হযরত শাহজালাল (র:)-এর সাথে সাথী হয়ে চলে আসেন।

দরগাহের পুকুরের সাথে যমযম কূপের সংযোগ…

সিলেট নগরটি গড়ে উঠেছে সুরমা নদীকে কেন্দ্র করে। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এ নদীর পানি বেশিরভাগ সময়ই ঘোলা থাকে। যারা সিলেটের সুরমা নদীর কাছে গিয়েছেন, তারা দেখে থাকবেন এর পানি কেমন হলদেটে। পাহাড়ি হলদেটে মাটির কণা এর মাঝে ভাসমান থাকে বলে এটি ঘোলা থাকে। নদীর ধারায় যখন স্রোত থাকে তখন পানির কণা তার সাথে করে কিছু মাটির কণাকেও নিয়ে যেতে পারে। পানি যখন স্থির হয়ে যায় তখন পানির কণার পক্ষে পলির কণা বহন করা সম্ভব হয় না, ফলে পলির কণা নীচের পড়ে যায়। সুরমা নদীতে বেশিরভাগ সময়ই স্রোত বিদ্যমান থাকে।

তখনকার সময় খাবার পানি এখনকার মতো সহজলভ্য ছিল না। এখন নলকূপ আছে, ফিল্টারকরণ পদ্ধতি আছে, তখন এসবের কিছুই ছিল না। সরাসরি নদী থেকেই পানি পান করতে হতো মানুষদেরকে। সিলেট অঞ্চলে পানির অন্যতম উৎস এই সুরমা নদী। কিন্তু এর পানি ঘোলা। পানি ঘোলা মানে এটি দূষিত, এখানের পানি পান করলে মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে। তাই অফুরন্ত একটি উৎস থাকা সত্ত্বেও মানুষ এর পানি পান করতে পারছে না। পানযোগ্য পানির পিপাসায় দিন পার করছে। এমন পরিস্থিতিতে এলাকাবাসী সকলে গেলো সে অঞ্চলের সেরা বুজুর্গ ব্যক্তি হযরত শাহজালাল (র:)-এর কাছে। তিনি সব শুনে আল্লাহর কাছে মোনাজাত করলেন যেন সিলেটবাসীর পানির কষ্ট দূর হয়ে যায়। শুধু দূরই নয়, সবচেয়ে সেরা মানের পানি যেন তারা পায় এ দোয়াও করলেন। তিনি আল্লাহর কাছে চাইলেন মক্কার যমযম কূপের সাথে যেন সিলেটের পানির সংযোগ হয়ে যায়। ফলে সিলেটের মানুষ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ পানীয় পান করার সুযোগ পাবে।

আল্লাহ তার দোয়া কবুল করে নিলেন। যখন তার মোনাজাত শেষ হলো তখন একটি গায়েবী আওয়াজ (অদৃশ্য শব্দ) ভেসে এলো। কেউ একজন হযরত শাহজালাল (র:)-কে বলছে, এ স্থানে যেন একটি কূপ খনন করে। সবাই মিলে তার দরবারের পাশে একটি কূপ খনন করলো। এরপর একদিন শুক্রবার এলো। বেশ কয়েকজন ভক্ত-অনুসারী নিয়ে তিনি কূপের কাছে গেলেন। তার হাতে ছিল একটি লাঠি। কূপে আঘাত করার জন্য সেই লাঠি তিনি উঁচিয়ে ধরলেন। আঘাত করা মাত্র গায়েবীভাবে নীচ থেকে পানি আসতে শুরু করলো। শুধু পানিই নয়, পানির সাথে করে রং-বেরংয়ের মাগুর, কৈ প্রভৃতি মাছও আসতে শুরু করলো। সে মাছের বংশধরদের এখনো দেখতে পাওয়া যায়। দর্শনার্থীরা আদর করে অনেক কিছু খেতে দেয় তাদের।

হযরত শাহজালাল (র:) আল্লাহর কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন এর সাথে যেন মক্কার যমযম কূপের সংযোগ স্থাপিত হয়, হলোও তা। এর পানি যমযমের মতোই স্বচ্ছ এবং সুস্বাদু। লাঠির আঘাতে সিলেটের কূপের সাথে মিলন ঘটে সুদূর মক্কার যমযম কূপের।

পরবর্তীতে একসময় ঐ কূপটির চারপাশ পাকা করে দেয়া হয়। একদিকে দুটি পাথর বসিয়ে দেয়া হয় যা থেকে সবসময় পানি প্রবাহিত হয়। পানীয় হিসেবে পান করার গণ্ডি ছাড়িয়ে এটি এখন অনেক কাজে ব্যবহার করা হয়।

তথ্য সংগ্রহে -মহসীনুর রহমান সজীব

Comments

comments

Powered by Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *