প্রচ্ছদ / ক্যাম্পাস / মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

 

পৃথিবীতে মানবকূলের সৃষ্টিই হয় কল্যাণের জন্য।তবে কম সংখ্যক মানুষই সফলকাম হয়।
বর্তমানে আমাদের দেশে যতগুলো উৎসব রয়েছে তন্মধ্যে মুজিববর্ষ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর ভাবনা ছিলো দেশকে নিয়ে,তাই দেশের ভাবনা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে।”শেখ মুজিবুর রহমান ” একটি নাম, একটি স্বাধীনতা,একটি বিজয় এবং একটি সফলতার গল্পের নায়ক।
ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের আয়তন বিশিষ্ট এশিয়ার দক্ষিণে অবস্থিত বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য আজীবন সংগ্রাম করে যাওয়া মানুষটির নাম”শেখ মুজিবুর রহমান “।
পারিবারিক ভাবে আদর করে ডাকতো “খোকা”,জনগণের কাছে ছিলো” বঙ্গবন্ধু”,আবার কেউ বলতো’ স্বাধীনতার মহানায়ক ‘,কেউ বলতো ‘রাজনীতির কবি’
,আবার সংবিধান স্বীকৃত জাতির পিতা হিসেবে।এছাড়াও ২০০৪সালের বিবিসি বাংলার জরিপে বঙ্গবন্ধুকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হিসেবে নির্বাচিত করে।এই বিস্ময়কর, ১৯২০সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করে।ছোটবেলা থেকেই তাঁর হৃদয়টা ছিল উদার প্রকৃতির। আমরা ছোটবেলায় পড়েছি, বঙ্গবন্ধু নিজের চাদর অসহায়কে দিয়ে আসতেন।নিজের ছাতা কোনো এক গরিবকে দিয়ে নিজে ভিজে ভিজে বাড়ি আসতেন। মানুষকে ভালোবাসার ইতিহাসটা ছোটবেলা থেকেই। আমি রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হিসেবে যতটুকু ইতিহাস পড়েছি ।বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর মতো এত অগ্রণী ভূমিকা অন্য কোনো নেতা রাখে নি।
স্বাধীনতা যুদ্ধে যারা ভূমিকা রেখেছে তাদের সবাইকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর অবদান অপরিহার্য । কারণ ৭ইমার্চের ভাষণের(বর্তমান পৃথিবীতে বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে খ্যাত) মতো ভাষণ অন্য কারো ভাষণ হলো না কেন? মহান একাত্তরের ২৬ই মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা করার পরপরই অন্য কোনো নেতাকে গ্রেপ্তার করা হলো না কেন?

শেখ মুজিবুর রহমান তার আয়ুষ্কালের ৫৫ বছরের প্রতিটি মুহূর্তে ব্যয় করেছেন বাঙ্গালি জাতির মুক্তি সংগ্রামে। বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ, বাঙালি জাতিসত্তা, স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশ এক ও অভিন্ন। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। এ দেশের মানুষ যাতে আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে এজন্য তিনি তার জীবন উৎসর্গ করেছেন।
তার রাজনীতির মূলমন্ত্রই ছিল আদর্শের জন্য সংগ্রাম, আদর্শের জন্য আত্নত্যাগ। যে আদর্শ, বিশ্বাস ও স্বপ্ন নিয়ে তিনি রাজনীতি করতেন, শত কষ্ট ও প্রচণ্ড চাপেও তিনি তাতে অটল ছিলেন—এটা আমরা দেখতে পাই তার ছাত্রজীবন থেকেই। ১৯৩৯ সালে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে তার কারাবরণ শুরু। বস্তুত জেল-জুলুম ও নিপীড়ন বঙ্গবন্ধুর জীবনে এক নিয়মিত অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল। জনগণের জন্য, দেশের জন্য তিনি তার ৫৫ বছরের জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাগারে ছিলেন, যা তার মোট জীবনকালের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে বাংলাদেশে ঐতিহাসিক যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রয়েছে, প্রতিটি ঘটনার মূখ্য চরিত্র বঙ্গবন্ধু। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন; ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের সাধারণ নির্বাচন; ১৯৬২ সালে শিক্ষা সংকোচন নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন; ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন; ১৯৬৮ সালের আগরতলা মামলা; ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুথান; ১৯৭০ সালের নির্বাচন; ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ; ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা; ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিশ্বের মানচিত্রে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ—পুরোটাই বঙ্গবন্ধুময়। তাই ছন্দে বলতে চাইঃ

“তুমি জন্মেছিলে বলেই
জন্মেছিল দেশ
মুজিব তোমার আরেক নাম
স্বাধীন বাংলাদেশ “

জাতির পিতার অন্যতম স্বপ্ন ছিল সোনার বাংলা বিনির্মাণ। কিন্তু স্বপ্নের সোনার বাংলা নির্মাণযাত্রা ছিল নানাভাবে কণ্টকাকীর্ণ ও বিপৎসংকুল। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ, ভৌত-অবকাঠামো, রাস্তাঘাট-ব্রিজ-যানবাহন, বিদ্যুৎ, টেলিফোন, প্রায় সবকিছুই বিনষ্ট—বিধ্বস্ত। প্রশাসন ছিল অসংগঠিত। বৈদেশিক মুদ্রার শূন্য ভাণ্ডার ও ভারসাম্যহীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিঃস্ব ও সহায়-সম্বলহীন কোটি শরণার্থীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন চ্যালেঞ্জ, বন্যা, খাদ্যাভাব। অন্যদিকে বিশ্বমন্দা ও নানা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে সামাজিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। ১৯৭৫সালের ১৫ই আগস্ট একদল দুষ্টচক্রের দ্বারা বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। বাদ যায় নি দশ লবছরের শেখ রাসেলও।কি নির্মম হত্যা!তবে ঐদিন আল্লাহর অশেষ রহমতে বেচে যায় বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য দুই কন্যা শেখ হাসিনাও শেখ রেহানা। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বাবার স্বপ্ন পূরণে আশায় দেশকে নেতৃত্ব দেন দেশরত্ন শেখ হাসিনা।

জাতির পিতার অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো বাস্তবায়ন করে চলেছেন তারই সুযোগ্য কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। স্বাধীনতার পরাজিত শক্তিরা বলেছিল—আগামী ১০০ বছরের মধ্যেও বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ডলার ছাড়াবে না। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় এই যে, মাত্র ৫০ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২০৬৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। অথচ ১৯৭০-এ মাথাপিছু গড় আয় ছিল ১৪০ ডলার। হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু অতি আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ৫০ বছরে বাংলাদেশ নামক ঝুড়িটি আর তলাবিহীন নয়; ঝুড়ি এখন সাফল্যে পরিপূর্ণ । জাতিসংঘের ৭০তম
অধিবেশনে সাবেক মহাসচিব বান কি মুন পৃথিবীর সকল উন্নয়নশীল দেশকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন -“আপনারা যদি উন্নয়নের কোন ধারাকে রোল মডেল হিসেবে নিতে চান তাহলে বাংলাদেশকে দেখুন,বাংলাদেশের উন্নয়নকে দেখুন”। বর্তমানে বাংলাদেশের রিজার্ভ ৪৪ বিলিয়ন ডলার।

মহামারি করোনাকালীন সময়ে বিশ্বের সব দেশে যখন প্রবৃদ্ধির হার কমে যাচ্ছে, তখন বাংলাদেশে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৮.২ শতাংশ এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলছে, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ অর্জিত হতে পারে। করোনাকালীন কঠিন সময়েও বাংলাদেশে গত ফেব্রুয়ারি, ২০২১ -এ ১৭৮ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে। এছাড়াও প্রবৃদ্ধির অর্জিত হয়েছে৫.২৪শতাংশ যা আশাব্যঞ্জক ঘটনা।

১৯৭২-১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের আকার ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা অথচ জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানি ৮১ গুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১.২ বিলিয়ন ডলার। একই সঙ্গে বেড়েছে রপ্তানি পণ্যের সংখ্যাও। স্বাধীনতার পর রপ্তানি আয়ের সত্তর ভাগ ছিল পাটের দখলে। বর্তমানে মোট রপ্তানির ৮২ শতাংশই তৈরি পোশাক খাতের দখলে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ভিশন ২০২১ দিয়েছেন এবং বাস্তবায়ন করেছেন যার মধ্য দিয়ে আমরা উন্নয়নশীল দেশ উন্নীত হয়েছে এবং ভিশন ২০৪১ এর মাধ্যমে আমরা আধুনিক এবং উন্নত দেশে পরিণত হব।

বাংলাদেশ অনেক উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে, বড় বড় ফ্লাইওভার করা হয়েছে, মেট্রোরেল মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে, মহাকাশে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, সারা দেশজুড়ে রাস্তাঘাট কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে, দেশের সর্ববৃহৎ পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ নিজস্ব অর্থায়নে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। কৃষি, খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন, আর্থ-সামাজিক প্রতিটি সূচক ও জরিপে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বের কারণেই দক্ষতার সাথে মহামারি করোনা মোকাবেলা করা সম্ভব হচ্ছে এবং বিশ্বের বহু বড় বড় দেশকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশ প্রথম সারির দেশ হিসেবে কোভিড-১৯ এর টিকাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেছে এবং প্রয়োগ শুরু হয়েছে।সম্প্রতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জোট (ডি-৮)এর সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উন্নয়নের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালে বাংলাদেশ একটি সুখী সমৃদ্ধ ও উন্নত রাষ্ট্রে উন্নীত হবে।

মুজিব একটি আদর্শ। এছাড়াও বিশ্বের নিপীড়িত, নিষ্পেষিত জাতি গুলোর কাছেও মুজিব ছিলো অনুপ্রেরণা। মুজিব কোনো দলের জন্য স্বাধীনতার ডাক দেননি। মুজিব শুধু আওয়ামী লীগের জন্য ঝাঁপিয়ে পরতে বলেননি। তাই আসুন মুজিববর্ষে মুজিববাদ তথা বঙ্গবন্ধুর দর্শনকে ধারণ করার চেষ্টা করি।

বাংলাদেশে বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন চলমান আছে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপিত হচ্ছে । মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী একে অপরের পরিপূরক। মুজিবের জন্ম না হলে হয়তো সুবর্ণজয়ন্তী পেতাম না।
তাই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে আমরা শপথ করি’ এ দেশ আমার। এদেশকে রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের। সকল ভেদাভেদ ভুলে, দল মত,ধর্ম,বর্ণ, নির্বিশেষে সকলে যে যেখানেই আছি, সেখান থেকে দেশের জন্য সর্বোচ্চটুকু করবো।এই দৃঢ় প্রত্যয়ে অঙ্গীকার বদ্ধ হই সবাই। সবশেষে বলতে চাইঃ

“একটি কবিতা রক্ত পলাশে আকাঁ
একটি মানুষ পতাকায় আকাঁ ছবি
বুকে একতারা শ্যামা দোয়েলের গান
মুজিবুর আজ সারা বাংলার কবি”

মোঃ মারুফ মজুমদার
রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

এছাড়াও চেক করুন

The Best Way To Choose The Best Photo Editor App

If you’re trying to find an expert looking photo editing program, you then may discover …