প্রচ্ছদ / প্রচ্ছদ / করোনার থাবা ; দেশীয় হালচাল

করোনার থাবা ; দেশীয় হালচাল

খালেদ সাইফুল্লাহ ইলিয়াছ

চীনের উহানে গত ডিসেম্বরের শেষ থেকে শুরু হয়ে টানা ১১ সপ্তাহ চলে করোনার তান্ডব।চীনের লুকিয়ে রাখার নীতির ফলে এটি ছড়িয়ে পড়ে ইরান সহ ইউরোপের দেশগুলোতে।ইরানও প্রথমদিকে লুকিয়ে রাখার নীতি অবলম্বন করে যার ফলে এটি অারো ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায়৷ এর মধ্যে COVID-19 ভাইরাসটি বৈশ্বিক মহামারি অাকারে অাবির্ভূত হয়।ভাইরাসটির রাসায়নিক গঠন,এর প্রকৃতি, এটা অাদৌ জৈব অস্ত্র কী না? এসব বিষয়ে টানা ৪ মাস ধরেই অালোচনা চলছে।এসব অালেচনা এখন সারা বিশ্বে সবার মুখে মুখে।এরকম অারো বহু প্রশ্নের উত্তর পেতে অামাদের হয়তো অারো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

যখন চীন,ইরান,ইতালিতে করোনার তান্ডব চলছিলো তখনো অামাদের দেশে এটি ছড়িয়ে পরেনি। অামরা প্রায় তিনমাস সময় পেয়েছিলাম নিজেদের গুছানোর বা এর গভীরতা অনুধাবন করার। কিন্তু অামরা কতটুকু নিজেদের প্রস্তুত করতে পেরেছি? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে অামাদের সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর দিকে একটু ফিরে তাকাতে হবে। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় অামাদের চোখের সামনে চলে অাসে এবং অাঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় অামাদের ভঙ্গুর সমাজব্যবস্থা, লোভী দৃষ্টিভঙ্গি,সামাজিক উদাসীনতা,সরকার ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা, ধর্মীয় দৈন্যতা,বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব সহ অারো অনেক কিছুই।

করোনার শুরুতে এক শ্রেণীর সচেতন জনগণ বারবার সরকারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অাহ্বান জানান।সরকারও এতে সাড়া দেয়। যার ফলে বিমান বন্দরগুলোতে স্থাপন করা হয় থার্মাল স্ক্যানার।নিঃসন্দেহে অামাদের সরকার প্রধান এ বিষয়ে যথেষ্ট অাগ্রহী ছিলেন।কিন্তু অামরা অবাক হয়ে দেখলাম অল্প কয়েকদিনের মধ্যে দুয়েকটি ছাড়া বাকি স্ক্যানারগুলো অকেজো হয়ে পড়ে অাছে।অনেকে টাকার বিনিময়ে সুস্থতার সনদ নিয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন। এক্ষেত্রে বন্দর কর্মকর্তারাই দায়ী। অাবার এরকমও শুনা গেলো অনেকে ঠান্ডা জ্বর নিয়ে এসেছেন।কিন্তু অাসার পূর্বে তিনটি চারটি নাপা এক্সট্রা খেয়েছেন যাতে করে স্ক্যানারে কিছু ধরা না পড়ে। অাদতে ঘটলো তাই৷ বাঙালির বুদ্ধির তারিফ করতেই হয়। তারপর যাদের বন্দর থেকে কোয়ারান্টাইনে পাঠানো হলো তাদের থাকা,খাবারে অব্যবস্থাপনা একের পর এক শিরোনাম হতে লাগলো। অাবার অনেক প্রবাসী বন্দর থেকে পালালেনও। যারা বিদেশে সব ধরণের নিয়ম পইপই করে পালন করেন দেশে এসে কেনো তারা উদাসীন এটা একটা বিস্ময়!

যখন দেশে করোনা পাওয়া গেলো গেলো রব উঠতে লাগলো তখন বাঙালি একরের পর এক বিষ্ময় উপহার দিয়ে গেছে।এক ডাক্তার কোথা থেকে বিবৃতি দিলেন ২৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বেশি হলে করোনা ভাইরাস কাজ করেনা।এই একটি ঘটনা বাঙালির যতটুকু প্রস্তুতি ছিলো তাকে একেবারে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।হয়তো বা সরকারও ভেবেছে এমন যে, যেহেতু বাংলাদেশে গ্রীষ্মকাল শুরু হচ্ছে তাতে করে অামাদের অার করোনার ভয় নেই। তাই না হলো বিদেশের ফ্লাইট বন্ধ নাহলো নস্ট স্ক্যানার ঠিক করণ অার না হলো বেশি করে কীট সংরক্ষণ। অার বাংলাদেশের তাপমাত্রায় করোনা কম কাজ করবে বলে প্রবাসী ভাইদের দেশে অাসার হিড়িক পড়ে গেলো।অার তারমধ্যে বেশ কয়েকদিন হয়ে গেলো কোনো করোনা রোগী ধরা পড়ছেনা তাহলে তো তাপমাত্রার ঘটনা সত্যি! এটা ভেবে মন্ত্রীরা খুশিতে গদগদ করতে লাগলেন। সেতুমন্ত্রী বলেই ফেললেন অামরা করোনার থেকে শক্তিশালী। যদিও তিনি বাঙালি জাতির ঐক্য, করোনার থেকেও শক্তিশালী বুঝাতে চেয়েছিলেন।কিন্তু বাঙালি একটু বেশি সমঝদার তাই তারা ঘরে ঘরে রটালো যে সরকার করোনার থেকে শক্তিশালী। তাপমাত্রার অাত্মবিশ্বাসে বলিয়ান হয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রী বললেন এটা নরমাল ফ্লু, অার স্বাস্থ্য মন্ত্রী সত্যি সত্যি ভেবে বসলেন করোনা তাপমাত্রার জন্য বাংলাদেশে ছড়াবে না।তাই তিনি সগৌরবে প্রচার করলেন অামাদের ব্যপক প্রস্ততি অাছে করোনা ভাইরাসে! অার তথ্যমন্ত্রীর অাবোল তাবোল নাই বললাম! অাসলে উনারা কেউই এই দূর্যোগের গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন নি৷ এখন যে ডাক্তার এই তাপমাত্রা তত্ত্ব বের করলেন তিনি এখন পিপিই গায়ে বসে অাছেন মাহয়ফুজুর স্যারের পাশে। অথচ এটা একটা গুরুতর অপরাধ ছিলো যে কোনো রকম এক্সপেরিমেন্ট ছাড়া এই ধরণের কথা প্রচার করা। বাঙালি এই তাপমাত্রা তত্ত্বটি ভালোভাবে খেয়েছিলো কারণ এটি সকলের অনুকূলের কথা ছিলো।অনুকূলের যেকোনো কিছু গুজব হোক অার গজব হোক বাঙালি সেটা বীর দর্পে গ্রহণ করতে উস্তাদ! অামি মনে করি, এই তাপমাত্রা তত্ত্ব বাংলাদেশের করোনা প্রস্তুতির বারোটা বাজিয়েছে।

এদিকে চীন ইতালি ইরানে করোনা তান্ডব দেখে এই দেশে সবথেকে বেশি খুশি হয়েছিলো ধর্মব্যবসায়ীরা। কারণ তারা এমন একটা মুখরোচক রসদ পেয়েছিলো যেটা এর অাগে তারা কোনোদিন পাইনি। তাই হাদীস কোরঅানের গভীরে প্রবেশ না করে এই ধর্মব্যবসায়ীরা বাঙালির অাবেগকে পুঁজি করে প্রচার করেছে এটা মুসলমানের কিছু হবেনা।যা হবার অন্যদের হবে।বাংলাদেশিরা অাবার ধর্মীয় ক্ষেত্রে খুব অাবেগপ্রবণ, যেখানেই যাক ধর্মীয় কথা শুনতে বলতে ভালোবাসে।সারাদিন মাইকে ওয়াজ বাজিয়ে কান্নাকাটি করবে কিন্তু নামাজের বেলায় ওই দুয়েককাতার। তারা সারাদিন ধর্ম ধর্ম করবে অাবার খাবার স্টক করবে,সুযোগ বুঝে দাম বাড়াবে,গুজব ছড়াবে,সুদ খাবে, ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়াবে না,মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ব্যবসা করবে কিন্তু তারা খুবই ধর্মভীরু।দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তিরা সহ সাধারণ জনগণের অনেকে বিশ্বাস করেছে হয়তো সত্যি সত্যি কিছু হবেনা।তাই যে যার মতো করে উদাসীনতা দেখিয়েছে।যার ফল এখন ভোগ করতে হবে সকলকে।এর মধ্যে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে থানকুনি পাতার গুজব,শিশু গুজব সহ অারো কত কী!

সর্বশেষ যে বিষয়টি অবাক করেছে অামাদেরকে সেটি হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভিডিও কনফারেন্স।সেখানে প্রায় অনেকগুলো জেলার সাথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংযুক্ত ছিলেন যেটি কিনা লাইভ সম্প্রচার হয়েছে টেলিভিশনে।সেখানে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন জেলা প্রশাসক, এমপি,পুলিশ সুপার, সেনা কর্মকর্তা,সিভিল সার্জন সহ জেলার সর্বেচ্চ কর্তাব্যক্তিদের সাথে। সেখানে সবাই একযোগে প্রধানমন্ত্রীকে বলে গেলেন কোথাও কোনো সমস্যা নেই সবকিছুই পর্যাপ্ত পরিমাণে অাছে।প্রশাসন, জনগণ সব ঠিক অাছে। জেলার সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ এত সুন্দর করে মিথ্যে বলতে পারে তা অাগে জানা ছিলো না। এটি সত্যি অবাক করার মতো।বিরল ঘটনা।বরং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবাইকে কয়েকবার করে জিজ্ঞেস করলেন কোথায় কী কী লাগবে?মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অান্তরিকতার কোনো ঘাটতি অামাদের চোখে পড়ল না। ঘাটতি শুধু দেখলাম ঔ ব্যক্তিগুলোর দায়িত্বশীল অাচরণের!
প্রধানমন্ত্রী জেনে গেলেন সবকিছু ঠিকঠাক চলছে অথচ সিলেটে একজন ডাক্তার যিনি করোনা অাক্রান্ত, অাইসিইউ সুবিধা পেলেন না,এয়ার এম্বুলেন্স পেলেননা ঢাকা যাওয়ার জন্য। হসপিটালে নেই ভেন্টিলেটর সুবিধা। নোয়াখালীতে মেডিকেল কলেজ অাছে নেই হসপিটাল। এক যায়গায় কীট অাছে তো টেস্ট করার যন্ত্র নেই।অারেক যায়গায় টেস্ট করার যন্ত্র অাছে তো কীট নেই। সব অাছে কিন্তু দক্ষ জনবল নেই!তাহলে এত সাজিয়ে গুজিয়ে মিথ্যে বলার কী দরকার ছিলো! এদিকে করোনা রোগী পালিয়ে যায় হসপিটাল থেকে।ডাক্তার নার্সদের পযাপ্ত পিপিই নেই।পিপিই পড়ে বসে অাছে এমপির ড্রাইভার! করোনা ছাড়াই চিকিৎসা না পেয়ে মরে যায় ঢাবির ছাত্র। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন অাক্ষেপ করে বিদেশি ডাক্তারের কথা বললেন।সেটা নিয়েও শুরু হলো হাজার অালোচনা। এদিকে অাবার অনেকের শয়তান মাথা হিসেব করে ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরার শাড়ির কালার, কতটা শাড়ি ইত্যাদি! এসব বিকৃত মস্তিষ্কের কাজ!যখন বলা হলো, জনগণের টাকায় ডাক্তার হয়েছে অামাদের ডাক্তাররা।তখন অাবার অনেকে হিসাব কষে হিসাব দেয় তারা জনগণ থেকে কত নিলো অার জনগণকে কত দিলো! তারপর গার্মেন্টস কাহিনীতো সবার জানা! সত্যি এগুলা অসুস্থ বিকৃত মাথার কাজ কারবার।

এতকিছুর পরেও অসংখ্য অাওয়ামীলীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী এই দূর্যোগে জনগণের পাশে এসে দাড়িয়েছে, ত্রাণ দিয়েছে, অনেকে অনেক অনেক পরিবারের দায়িত্বও নিয়েছে।জনগণকে সচেতন করতে মাইকিং হ্যান্ড স্যানেটাইজার বিতরণ করেছে। অথচ দু-চারশ চাউল চুর অাওয়ামীলীগার, এদের অর্জনকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে।জনগণ অাওয়ামীলীগের হাজার হাজার ভালো কাজকে পাশ কাটিয়ে মনে রাখছে চাল চোরদের! সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুধুই চাল চোরের কাহিনী।তবে এই দূর্যোগকালীন সময়ে ত্রাণচুরদের যদি সরকার ঠেকাতে ব্যর্থ হয় তাহলে কিন্তু এর খেসারত সরকার এবং অাওয়ামীলীগকেই দিতে হবে!

এই দূর্যোগকালীন সময়ে অামরা প্রচুর ভালো মানুষের দেখা পেয়েছি যারা ব্যক্তি উদ্যোগে প্রচুর ত্রাণ বিতরণ সহ সচেতনতামূলক কাজ করেছে।বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন, এক টাকার অাহার এরা মানবতার অনন্য উপহার।এছাড়া অাওয়ামীলীগ,যুবলীগ, ছাত্রলীগের পাশাপাশি সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট,ইসলামি অান্দোলন বাংলাদেশ, সাধারণ ছাত্র ঐক্য পরিষদ,বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন, সামাজিক -সাংস্কৃতিক জোটগুলোও তাদের ত্রাণ বিতরণ ও সচেতনামূলক কাজগুলো অব্যাহত রেখেছে।তাছাড়াও সশস্ত্র বাহিনী, প্রশাসন ক্যাডার,শিক্ষক পরিষদ, বিভিন্ন গ্রুপ অব কোম্পানি , বিভিন্ন চাকুরীজীবী-পেশাজীবী পরিষদ গুলো যেভাবে প্রধানমন্ত্রীর ত্রান তহবিলে দান করেছেন সত্যি সেটা এক অনন্য দৃষ্টান্ত।দেরিতে হলেও সরকার সহ প্রশাসন বুঝতে পেরেছেন পায়ের তলায় কতটুকু মাটি অাছে! তাই শেষেরদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা,স্বাস্থবীমার ঘোষণা সহ ৩১ দফা নির্দেশনা ভূয়সী প্রশংসার দাবি রাখে।বিভিন্ন হটলাইন সেবা, প্রশাসনের কঠোর অবস্থান অামাদের অাশার অালো দেখাচ্ছে। মহল্লায় মহল্লায়,গ্রামে গ্রামে সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো প্রমাণ করেছে বিপদ গাড়ে এসে পড়লে বাঙালি সবটুকু দিয়ে চেস্টা করে

পরিশেষে বলব করোনা মোকাবেলায় সরকার, সশস্ত্র বাহিনী,ডাক্তার, মাঠ প্রশাসন,ব্যাংকার সহ প্রত্যেকেই অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা সফল হোক, জয় হোক মানবতার।

লেখকঃ খালেদ সাইফুল্লাহ ইলিয়াছ
কবি ও সাবেক গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক,বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

এছাড়াও চেক করুন

রাজনৈতিক মামলায় পলাতক সৈয়দ মো: ওবায়েদ উল্যাহ

ফেনী সদর উপজেলার শর্শদী ইউনিয়নের দক্ষিন খাসেবাড়ী মোস্তাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা সৈয়দ মো: ওবায়েদ উল্যাহ পিতার- …